সম্মানিত পাঠক, নিশ্চয়ই আপনারা অবগত আছেন যে, গত কয়েকদিন আগে বাউল শিল্পী শরিয়ত সরকার টাঙ্গাইলের একটি আসরে গান পরিবেশনের সময় কথিত আলেম সমাজের কাছে ৫০ লক্ষ টাকার একটি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছিলেন। আর সেই চ্যালেঞ্জটি ছিল, যদি কেউ প্রমাণ করতে পারে যে, গান বাজনা হারাম, তাহলে সে নিজেও গান গাইবে না এবং অন্য কাউকেই গান গাইতে দেবে না। কিন্তু অতিব দুঃখের বিষয় এই যে,, কথিত আলেম সমাজ শরিয়ত সরকারের সেই চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা গান বাজনা হারাম নাকি হালাল তা প্রমাণ না করে প্রশাসনের সাহায্যে তার মুখ বন্ধ করার পথ বেছে নেন। আর সে সূত্র ধরেই কথিত আলেম সমাজ শরিয়ত সরকারের বিরুদ্ধে টাঙ্গাইল জেলার মির্জাপুর থানায় একটি অভিযোগ দায়ের করেন। আর তার অভিযোগের বিষয় বস্তু হল, শরিয়ত সরকার আল্লাহ্‌, নবি-রাসুল, কোরআন ও ধর্মকে কটূক্তি করেছে। কিন্তু যে ভিডিওটির ভিত্তিতে কথিত আলেম সমাজ আল্লাহ্‌, নবি-রাসুল, কোরআন ও ধর্মকে কটূক্তি করার অভিযোগ করেছে, সেই ৫৯ মিনিটের ভিডিওটির কোথাও উক্ত কটূক্তির বিষয়ে কোন বক্তব্য খুজে পাওয়া যায়নি। তথাপিও আপনারা দেখেছেন যে, উক্ত অভিযোগর ভিত্তিতে অতি দ্রুততার সহিত মির্জাপুর থানার অসি শরিয়ত সরকারকে গ্রেপ্তার করে ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করে, এবং তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর হয়। বর্তমানে তিনদিনের রিমান্ড শেষে তাকে জেল হাজতে প্রেরণ করা হয়েছে।

উক্ত ঘটনা পর্যালোচনা করলে প্রতিয়মান হয় যে, মির্জাপুর থানার অসি নিজেকে নিরপেক্ষ অবস্থানে ধরে রাখতে পারে নি, তিনি যা করেছেন তার সবটুকুই পক্ষপাত মূলক ও প্রতিহিংসা মূলক। কারণ, শরিয়ত সরকার যেখানে গান বাজনা হারাম না হালাল এবিষয়ে ৫০ লক্ষ টাকার চ্যালেঞ্জ দিয়েছেন, সেখানে তাকে গ্রেপ্তার ও রিমান্ডে না নিয়ে অভিযোগকারী ও চ্যালেঞ্জদাতাকে এক বৈঠকে বসিয়ে হাদিস কোরআনের মাধ্যমে গান বাজনা হারাম না হালাল তা প্রমাণ করে বিষয়টি মিমাংসা করতে পারতেন। কিন্তু তিনি সেটা না করে গ্রেপ্তার ও রিমান্ডের পদক্ষেপ নেয়ায় তিনি নিজেই যে গান বাজনার বিপক্ষে সেটা সন্দেহাতীত ভাবেই প্রমাণিত। এ প্রেক্ষিতে তিনি যে নিরপেক্ষ  ভুমিকা পালন করেছেন তা প্রমাণে আমরা তার থানায় একটি অভিযোগ করতে চাই। আর সে অভিযোগটি হবে কথিত আলেম সমাজ তাঁদের বিভিন্ন ওয়াজে বাউল শিল্পী, বাউল গান, দরবার ও মাজার নিয়ে যে সকল কটূক্তিকর বক্তব্য সম্বলিত ভিডিও ইউটিউবে ছেড়েছে সেই ভিডিওর সূত্রে ধরে। যদি দেখা যায় যে, এখানেও অসি সাহেব শরিয়ত সরকারের মতই দ্রুততার সহিত ওয়ায়েজানকে গ্রেপ্তার ও ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করেন, তাহলেই কেবল প্রমাণ হবে যে তিনি নিরপেক্ষ।

সম্মানিত পাঠক! আসুন দেখে নেয়া যাক যে, কোরআন হাদিসের আলোকে গান বাজনা আসলেই যায়েজ না, নাযায়েজ। নিম্নে আমি যে হাদিসটি উপস্থাপন করছি, সে হাদিসটি হল, বুখারি শরিফ ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা নম্বর ২০৪, হাদিস নম্বর ৯০২। 

 

 

সম্মানিত পাঠক, উপরের হাদিসটির দ্বিতীয় লাইনটি পড়ে দেখুন, যার আরবিতে লেখা আছে তুগান্নিইয়ানি বি গিনায়ি  যার বাংলা অর্থ দুজন গায়িকা গান পরিবেশন করছিল। কিন্তু কথিত আলেম সমাজ এই হাদিসটির বাংলা অর্থ করেছেন কবিতা আবৃত্তি করছিল। তার মানে এখানে বুঝতে একটুও অসুবিধা হবে না যে, এই আলেম সমাজ গান পছন্দ করে না। তাই হাদিসে আরবি গিনা লেখা থাকলেও, তারা তার অর্থ গান না লিখে কবিতা লিখেছেন। তার মানে কথিত আলেম সমাজ মুসলিম বিশ্বকে বিভ্রান্ত করার জন্য হাদিসের মিথ্যা অর্থ উপস্থাপন করেছে। এটা কি জঘন্য অপরাধ নয়। এটার বিচার আমি ধর্মপ্রাণ মুসলমানের কাছে রাখলাম। তবে শুধু হাদিস নয়, পবিত্র কোরআনের কম পক্ষে এক হাজার আয়াতের তারা মিথ্যা শব্দ প্রয়োগের মাধ্যমে বিকৃত অনুবাদ করেছে। আপনারা চাইলে আমি তা উপস্থাপন করবো ইনশাআল্লাহ। যারা কোরআন হাদিসের মিথ্যা ও বিকৃত অনুবাদ করে, তারা কি মুসলমানের মধ্যে পড়ে। আশা করি ধর্মপ্রাণ মুসলমানেরা এটা বিবেচনা করবেন।

উপরিউক্ত হাদিসে আরবিতে পরিস্কার লেখা আছে যে, গান পরিবেশ করছিল মিজমার সহ। তাই আবু বকর বলেছে যে রাসুলের সামনে শয়তানের বাদ্যযন্ত্র বা মিযমারে শয়তানি। প্রকাশ থাকে যে, আরবি জুমার শব্দের বাংলা অর্থ বাদ্য। আর মিযমার অর্থ বাদ্যযন্ত্র। তার মানে, রাসুল বাদ্যসহ গান শুনছিলেন। বাদ্য বলতে তিনটি যন্ত্রের সম্মিলন। আর তা হল- ঢোল, কাঁসি ও বাঁশী। আর তার সাথে গীত সংযোগ হলে তাকে বলে সঙ্গীত। তাহলে উক্ত হাদিস দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, রাসুল বাদ্যসহ গান শ্রবণ করেছেন ও গাওয়ার অনুমতি দিয়েছেন।

এবার গান যায়েজের পক্ষে বুখারি শরীফ ২য় খণ্ডের আরেকটি হাদিস উপস্থাপন করছি। এটা ৯০৪ নম্বর হাদিস।

উপরিউক্ত হাদিসটিতে ও বাংলা অনুবাদে গানের জায়গায় কবিতা লিখেছে, তবে আরবিতে লেখা আছে- তুগান্নিইয়ানি বিমা তাকাওয়ালাতি। অর্থাৎ তারা দুজন মহিলা কাওয়ালি গান পরিবেশন করছিল। তবে, তারা কোন পেশাগত গায়িকা ছিলনা এ কথা হাদিসটির আরবিতে লেখা নাই। এখন আপনারা বিবেচনা করুন যে, যারা আরবিতে গিনা বা বাংলায় গান শব্দটি থাকার পরেও তারা বিকৃত অনুবাদের মাধ্যমে কবিতা লিখেছে, সেই কথিত আলেম সমাজ মুসলিম না অমুসলিম।

এবার আমি গান বাজনার স্বপক্ষে নিম্নে মুসলিম শরীফের একটি হাদিস উপস্থাপন করছি। এটা মুসলিম শরীফ ৩য় খণ্ড, হাদিস নম্বর ১৯৩৮।

 

উক্ত হাদিসে পরিস্কার লেখা আছে যে, রাসুল বাদ্য সহ গান শুনেছেন ও গাওয়ার অনুমতি দিয়েছেন। তাহলে কিসের ভিত্তিতে কথিত আলেম সমাজ বাদ্যসহ গানকে হারাম বলে? আশাকরি আপনারা কথিত আলেম সমাজের  নিকট থেকে জেনে নিবেন। 

আসুন এবার যন্ত্রসহ গানের পক্ষে তিরমিযি শরীফ কি বলছে তা দেখে নিই। তিরমিযি শরীফ দ্বিতীয় খণ্ডের ১০৯০ নম্বর হাদিসে উল্লেখ আছে-

সম্মানিত পাঠক, শরিয়ত সরকার তার ঐ ভিডিওতে বলেছে যে, দাউদ নবী শুধু নবীই ছিলেন না, তিনি একজন বয়াতিও ছিলেন। তিনি মুখ দিয়ে ২৩ প্রকার বাদ্যযন্ত্র বাজাতেন। আসলে এই কথাটি কি সে সঠিক বলেছে না বেঠিক বলেছে তা জানা যাবে পবিত্র কোরআনের সূরা সাবা এর ১০ নম্বর আয়াটিতে। শরিয়ত সরকার এই আয়াতটি তার ভিডিও তে উল্লেখ করেছে। তবে ভুলে সে ১০ নম্বরের জায়গায় ৯ নম্বর আয়াত বলেছে। এটা অনেক বড় কোন ভুল নয়। আসুন দেখে নিই সূরা সাবার ১০ নম্বর আয়াতে কি বলছে।

তাফসীরে ইবনে কাসির সূরা সাবা এর যে ব্যাখ্যা উপস্থাপন করেছে, সেটিই উপরিউক্ত তাফসীর।  উক্ত ব্যাখ্যাটি পড়লে প্রতীয়মান হয় যে, দাউদ নবী সুমধুর কণ্ঠে গান পরিবেশন করতেন এবং তার কণ্ঠস্বর বাদ্যযন্ত্রের থেকেও উত্তম ছিল। তার মানে, দাউদ নবী মুখ দ্বারা বাদ্যযন্ত্র বাজাতেন ও গান পরিবেশন করতেন। 

এবার আসুন যেই দাউদ নবীকে নিয়ে কথা হচ্ছে সেই দাউদ নবীর উপর নাজিলকৃত কিতাব যবুর, দাউদ নবীর গান গাওয়ার বিষয়ে কি বলেছে তা দেখে নিই। বাইবেল ওল্ড টেস্টামেন্ট যুবুর এর ২৯৮ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে-

সর্বশেষ আমি উপস্থাপন করবো বাইবেল ওল্ড টেস্টামেন্ট যুবুর এর ৩২৩ পৃষ্ঠায় দাউদ নবীর গান গাওয়া বিষয়ে কি বলেছে।

এতেই প্রমাণিত হয় যে, দাউদ নবী একজন শিল্পী বা বয়াতি ছিলেন ও গান পরিবেশন করেছেন।  

এখন আপনারা বিচার করুন শরিয়ত সরকার কিছু ভুল বা মিথ্যা বলেছে কি? যদি সে ভুল ও মিথ্যা না বলে থাকে তাহলে সে জেলে কেন?

 

 

 

(457)

2 Responses

  • মাসুম মিয়া

    সত্য সহায় হোক গুরুজী

  • গুরুজি

    মাসুম মিয়া

    সত্য সহায় হোক গুরুজী

    সত্য সহায় হউক সর্ব জীবে।

     

Leave a Reply