৩৪ হিজরী সনের শেষ নাগাদ পর্যন্ত, অর্থাৎ জিলহজ্জ মাসের হজ্জ সমাপন পর্যন্ত আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা ইসলামী রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ স্থানসমূহ, যথা, মিশর, বসরা, সিরিয়া, কুফা, মক্কা ও মদিনার প্রায় সকল স্থানের, সকল গোত্র হতে ১৮ হাজার আয়াত সমৃদ্ধ প্রচলিত কোরআনের উপর বিশ্বাস স্থাপনকারীদের নিয়ে, আলী ইবনে আবু তালিবের পক্ষে একটি জোট তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিলেন।

(বত্রিশ)

বিশেষ করে ওমোর ইবনে খাত্তাব নিহত হওয়ার পরে, ইসলামের তৃতীয় খলীফা নির্বাচনের সময় উমাইয়া পরিবারের ষড়যন্ত্রের হাত থেকে ইসলামকে রক্ষা করার জন্য, নিজের ভোট ও তাঁর পক্ষের ভোটটিও ওসমান ইবনে আফফানকে প্রদানের মাধ্যমে, ইসলামের শত্রু আবু সুফিয়ানের একান্ত আপনজন আব্দুর রহমান ইবনে আওফকে পরাজিত করে, ওসমান ইবনে আফফানকে বিজয়ী করার জন্য, আলী ইবনে আবু তালিব মুসলিম উম্মাহর হৃদয় জয় করে নিয়েছিলেন। তৎকালীন সময়ের প্রায় সকল মুসলমানই বিশ্বাস করতো যে, মোহাম্মদের প্রচারিত ইসলাম প্রতিষ্ঠা করতে হলে আলী ইবনে আবু তালিবকেই ইসলামের খলীফা নির্বাচিত করতে হবে। অপরদিকে আলী প্রকাশ্যে ঘোষণা করেছিলেন যে, রাষ্ট্র প্রধান হওয়ার জন্য কোন কালেই আমি খলীফার দায়িত্ত্ব গ্রহণ করবো না। রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত না হয়েও আমি আলী, মোহাম্মদ ইন্তেকালের পর থেকেই ইসলামের প্রথম খলীফা ছিলাম, আছি এবং থাকবো।

৩০ হিজরী সনে ওসমান ইবনে আফফান ও আলী ইবনে আবু তালিব প্রচলিত কোরআনকে গ্রন্থ আকারে প্রকাশের যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিলেন, ৩৪ হিজরী সনে সে সিদ্ধান্তকে বাস্তবায়নের জন্য ওসমান ইবনে আফফান অর্থ বরাদ্দ করেন ও প্রচলিত কোরআনকে গ্রন্থ আকারে প্রকাশের কাজে লোক নিয়োগ করেন। ওসমান ইবনে আফফানের লক্ষ ছিল ৩৫ হিজরী সনের হজ্জের সময় অর্থাৎ যিলহজ্জ মাসে প্রচলিত কোরআন গ্রন্থ মুসলিম বিশ্বের প্রধান ব্যক্তিবর্গের নিকট পৌঁছে দেবে। আর সে লক্ষেই ৩৫ হিজরী সনে রমজান মাসে প্রচলিত কোরআন গ্রন্থ আকারে প্রকাশের কাজ সমাপ্ত করতে সকল পরিকল্পনা গ্রহণ ও সে অনুযায়ী প্রকাশনার কাজ চালিয়ে যাচ্ছিলেন।

মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান ওসমান ইবনে আফফানের কাছে জানতে চান, যে প্রচলিত কোরআন গ্রন্থ আকারে প্রকাশ করতে যাচ্ছেন, সে প্রচলিত কোরআনের রূপ রেখা কেমন হবে। ওসমান ইবনে আফফান পরিস্কার জানিয়ে দেন, বর্তমানে প্রচলিত কোরআনের পাণ্ডুলিপিতে থাকা প্রায় আট হাজার আয়াত সমৃদ্ধ প্রচলিত কোরআনই গ্রন্থ আকারে প্রকাশ করা হবে। কিন্তু সেই প্রচলিত কোরআনে উল্লেখ রাখা হবে যে, মোহাম্মদের জীবদ্দশায় প্রচলিত কোরআনের আয়াত সংখ্যা প্রায় আঠারো হাজারের মতো ছিল। কিন্তু মোহাম্মদের ইন্তেকালের পর আবু বকরের খেলাফতি গ্রহণকালে প্রচিলত কোরআন থেকে কেন, এবং কীভাবে আয়াত সংখ্যা কমিয়ে প্রায় আট হাজার আয়াত সমৃদ্ধ প্রচলিত কোরআনে রূপান্তরিত হলো।

৩৪ হিজরি সনে আবু সুফিয়ানের ইন্তেকালের পরে ও ইতিমধ্যে আব্দুর রহমান ইবনে আওফ মৃত্যু বরণ করায় মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান মানসিক ভাবে একটু দুর্বল হয়ে পড়ে। তথাপিও সে তাঁর অনুসারীদের নিয়ে সিদ্ধান্তে উপনিত হয় যে, যে কোন মুল্যে ৩৫ হিজরী সনের হজ্জের পূর্বেই

(তেত্রিশ)

ওসমানকে ক্ষমতাচ্যুত করতে হবে, নয় তাঁকে হত্যা করতে হবে। আর তা করতে না পারলে ওসমান ইবনে আফফান ও আলী ইবনে আবু তালিবের সমর্থকদের সাথে পেরে উঠা যাবে না, এবং কোন অবস্থাতেই ১৮ হাজার আয়াতের প্রচলিত কোরআনের কথা গোপন রাখা যাবে না, ও কোন অবস্থাতেই মোহাম্মদের দেওয়া আইন বাস্তবায়ন রহিত করা যাবে না।

মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান আয়েশা বিনতে আবু বকরকে অবহিত করে যে,  ওসমান কর্তৃক প্রচলিত কোরআন গ্রন্থ আকারে প্রকাশ ও সেই গ্রন্থে মোহাম্মদের জীবদ্দশায় প্রচলিত কোরআনের আয়াত সংখ্যা ১৮ হাজার ছিল, এবং আবু বকর ক্ষমতার লোভে উমাইয়া পরিবারের সাথে একজোট হয়ে প্রায় দশ হাজার আয়াত পুড়িয়ে দিয়েছে বিষয়টি প্রচলিত কোরআন গ্রন্থে উল্লেখ রাখতে চাই। সেই সাথে সে আয়েশা বিনতে আবু বকরকে পরামর্শ দেয় যে, ওসমান ইবনে আফফান যদি তাঁদের সিদ্ধান্ত মতো প্রচলিত কোরআন গ্রন্থ আকারে প্রকাশ করে, তাহলে আপনার বাবা আবু বকর মুসলিম সমাজের কাছে খল নায়ক হিসাবে পরিচিতি পাবে, এবং সকল মুসলমান আপনার বাবাকে কিয়ামত পর্যন্ত ঘৃণার চোখে দেখবে। তাই, ওসমান ইবনে আফফানকে কোন অবস্থাতেই প্রচলিত কোরআন গ্রন্থ আকারে প্রকাশ করতে দেওয়া যাবে না। সেই সাথে তারা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে যে, তাঁদের উদ্যোগে প্রচলিত কোরআনকে গ্রন্থ আকারে প্রকাশ করতে হবে, এবং প্রতিষ্ঠিত করতে হবে যে আমাদের প্রকাশিত প্রচলিত কোরআন গ্রন্থে যে আয়াত সকল স্থান পেয়েছে, মোহাম্মদের জীবদ্দশাতেও প্রচলিত কোরআনের আয়াতসংখ্যা এই ছিল।

৩৫ হিজরি সনে যখন ওসমানের নেতৃত্বে প্রচলিত কোরআন গ্রন্থ আকারে প্রকাশের কাজ চলছিলো, তখন আয়েশ বিনতে আবু বকর ও মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান গোপনে সিরিয়াতে তাঁদের মতো করে প্রচলিত কোরআন গ্রন্থ আকারে প্রকাশের কাজ চালিয়ে যাচ্ছিল। ইতিমধ্যে মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে যে, ওসমান ইবনে আফফান কর্তৃক প্রচলিত কোরআন গ্রন্থ আকারে প্রকাশ ও বিতরণের পূর্বেই তাঁকে ক্ষমতাচ্যুত করতে হবে, নচেৎ হত্যা করতে হবে, এবং মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান ও আয়েশা বিনতে আবু বকর কর্তৃক গ্রন্থ আকারে প্রকাশিত প্রচলিত কোরআনের গ্রন্থকে ওসমান ইবনে আফফান কর্তৃক প্রকাশিত গ্রন্থ বলে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।

আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ানের সিদ্ধান্ত বিষয়ে অবগত হয় যে, এবারের হজ্জের সময় অর্থাৎ, ৩৫ হিজরী সনের হজ্জের সময় তাঁরা ওসমান ইবনে আফফানকে ক্ষমতাচ্যুত করবে নয় হত্যা করবে। তখন সে আলী ইবনে আবু তালিবকে এ বিষয়ে অবহিত করে যে, যে কোন মুল্যে মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান ও যারা মুসলিম না হয়েও ইসলামে অনুপ্রবেশ করেছে তাঁরা, এবারের হজ্জের পূর্বেই ওসমান ইবনে আফফানকে ক্ষমতাচ্যুত করবে, নয় হত্যা করবে। এ লক্ষে

(চৌত্রিশ)

তাঁরা যে কোন মুহূর্তে অতর্কিত মদিনা আক্রমণ করতে পারে। মদিনাবাসীরা যেন এ বিষয়ে সজাগ দৃষ্টি রাখে ও ওসমান ইবনে আফফানকে রক্ষার ব্যবস্থা গ্রহণ করে।

আলী এবনে আবু তালিব আব্দুল্লাহ ইবনে সাবার সন্দেহের বিষয়, অর্থাৎ এবারের হজ্জের পূর্বেই মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান ওসমান ইবনে আফফানকে ক্ষমতাচ্যুত অথবা হত্যা করবে, তা ওসমান ইবনে আফফানকে অবহিত করলে, ওসমান বলে মদিনার সকল গন্যমান্য ব্যক্তিদের মাধ্যমে উক্ত বিষয়ে সজাগ থাকার পরামর্শ দেয়।

আগে থেকেই মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান আয়েশা বিনতে আবু বকরকে জানিয়ে রাখে যে, এবারের হজ্জ সমাপনের পূর্বেই ওসমান ইবনে আফফানকে ক্ষমতাচ্যুত অথবা হত্যা করা হবে, তাই সে যেন আগেভাগেই হজ্জের উদ্দেশ্যে মক্কা গমন করে, এবং যতক্ষণ পর্যন্ত সে মদিনায় ফিরে আসতে না বলে, ততক্ষণ পর্যন্ত আয়েশা বিনতে আবু বকর যেন মদিনায় ফিরে না আসে। সে মোতাবেক ৩৫ হিজরী সনের সওয়াল মাসের প্রথম সপ্তাহেই আয়েশা বিনতে আবু বকর হজ্জের উদ্দেশ্যে মদিনা থেকে মক্কার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়ে যায়।

আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা মিশরে অবস্থান করে মোহাম্মদের হাতে হাত রেখে যারা বাইয়াত গ্রহণ করেছিলেন, ও সে সময় যতজন সাহাবী জীবিত ছিল, ও সে সকল সাহাবীদের অনুসারী যারা ছিল, ও যারা ১৮ হাজার আয়াত সমৃদ্ধ প্রচলিত কোরআন বিষয়ে অবগত ছিল ও যারা ১৮ হাজার আয়াত সমৃদ্ধ প্রচলিত কোরআন প্রতিষ্ঠিত করতে চাই, তাদেরকে ঐক্যবদ্ধ করে। আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা’ কর্তৃক মোহাম্মদের হাতে হাত রেখে বাইয়াত গ্রহণকারীদিগকে যখন এক ছাতার নিচে আনতে সক্ষম হয়েছে, ও আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা’র প্রচারণায় ওসমান ইবনে আফফান কোন বিরোধিতা না করায়, মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান ও ইসলাম গ্রহণ না করেও মুসলিম নামধারীরা দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হয় যে, কোন অবস্থাতেই ওসমান ইবনে আফফানকে খলীফা পদে রাখা যাবে না। যে কোন মুল্যে ওসমান ইবনে আফফানকে ক্ষমতাচ্যুত করতে হবে, নয় তাঁকে হত্যা করতে হবে।

তখন প্রশ্ন আসে যে, ওসমান ইবনে আফফানকে ক্ষমতাচ্যুত অথবা হত্যা করা হলে, কাহাকে রাষ্ট্রের চতুর্থ খলীফা নির্ধারণ করা হবে, সে ব্যপারে মতানৈক্যের সৃষ্টি হয়। কারণ, আলী ইবনে আবু তালিব পূর্বেই সিদ্ধান্তে উপনিত হয়েছিলেন এবং সর্ব সমক্ষে প্রকাশ করেছেন যে, কোন অবস্থাতেই সে রাষ্ট্রের খলীফা হিসাবে নিযুক্ত হবে না। মোহাম্মদের নির্দেশ অনুযায়ী প্রচলিত কোরআনে উল্লিখিত “আমার মৃত্যুর পরে আলীই হবে ইসলামের প্রথম খলীফা” সূত্রে, সে নিজেকে ইসলামের প্রথম খলীফা হিসাবেই থেকে যাবে। তাই মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান ও ইসলামে অনুপ্রবেশকারী দলেরা

(পঁয়ত্রিশ)

ইসলামের চতুর্থ খলীফা হিসাবে তালহা ও যুবায়ের এর মধ্যে যে কাউকে নির্বাচিত করার পক্ষে মত দেয়। তখন একজন বলে যে, আলী ইবনে আবু তালিব উপস্থিত থাকতে সে কখনোই খলীফা পদ গ্রহণ করতে রাজী হবে না। আর যুবায়েরের বিষয়ে বলে যে, যুবায়ের কে চতুর্থ খলীফা হিসাবে  নির্বাচিত করলে সাধারণ জনগণ তা মেনে নেবে না, এবং দেশে বিপ্লব ঘটে যাবে ও রাষ্ট্র ক্ষমতা চিরতরে আমাদের হাত ছাড়া হয়ে যাবে। তখন তারা সিদ্ধান্তে উপনিত হয় যে, আলী ইবনে আবু তালিব আপোষে খলীফা পদ গ্রহণ না করলে, জোর করে হলেও আলিকেই চতুর্থ খলীফা নির্বাচিত করা হবে।

ওসমান ইবনে আফফানকে হত্যার পূর্ব পরিকল্পনা মতো, মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান কর্তৃক হজ্জ যাত্রার নামে এক হাজার লোক মিশর থেকে মক্কার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়। আব্দুর রহমান ইবনে আদীস, কিনানা ইবনে বাশার ইয়ামেনী, সুদান ইবনে ইমরান এই কাফেলায় অন্তর্ভুক্ত হয়। এই কাফেলার নেতা নির্বাচিত হয়, গাফিকী ইবনে হারব মক্কী। যিনি ছিলেন ইসলামের ঘোর শত্রু কুরাইশ বংশের উমাইয়া শাখার নেতা আবু সুফিয়ায়ানের পিতা হারব এর বংশের লোক। সিদ্ধান্ত হয় যে, সব লোক একসাথে রওয়ানা হবে না, বরং চারটি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দলে বিভক্ত হয়ে একের পর এক মিসর থেকে রওয়ানা হবে, এবং কয়েকটি মনজিল অতিক্রম করার পর পুনরায় একে অপরের সাথে মিলিত হবে।

মালিক আশতারের নেতৃত্বেও কুফা থেকে মক্কার উদ্দেশ্যে এক হাজার লোকের আরেকটি কাফেলা অনুরূপ ভাবে (চার ভাগে বিভক্ত হয়ে) রওয়ানা হয়। যায়দ ইবনে সাফওয়ান আবদী, যিয়াদ ইবনে রফর হারিসী, আব্দুল্লাহ ইবনে আসিম আমিরী ঐ কাফেলায় অন্তর্ভুক্ত হয়। এভাবে হোরকাওস ইবনে যুহায়েদের নেতৃত্বে এক হাজার লোকের একটি দল বসরা থেকে মক্কার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়। এই দলে হাকিম ইবনে জাবাল্লা আবদী, বাশার ইবনে শুরাইয়া কায়িসী অন্তর্ভুক্ত ছিল। কাফেলাগুলো হিজরী ৩৫ সনের শওয়াল মাসে নিজ নিজ শহর থেকে রওয়ানা হয়, এবং সকলেই এই কথা প্রচার করে যে, তারা হজ্জের উদ্দেশ্যে যাত্রা করছে। তারা মুয়াবিয়া ইবনে আবু সিফিয়ান কর্তৃক নির্দেশিত ছিল যে, যেন হজ্জের পূর্বেই তারা ওসমান ইবনে আফফানকে ক্ষমতাচ্যুত করবে, নয় তাঁকে হত্যা করবে।

তারা চার ভাগে বিভক্ত হয়ে নিজ নিজ শহর থেকে বের হয় এবং কিছুদূর অগ্রসর হওয়ার পর পুনরায় একত্রিত হয়। এভাবে বেশ কয়েক মঞ্জিল অতিক্রম করার পর তিনটি শহরের তিনটি কাফেলাই অর্থাৎ কুফা, বসরা ও মিশর থেকে আগত কাফেলা সমূহ পরস্পরের সাথে মিলিত হয়, এবং এক কাফেলায় রূপান্তরিত হয়ে মদিনা শরীফের দিকে রওয়ানা হয়। মদিনা হতে তিন মঞ্জিল দূরে এসে কাফেলা তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে একভাগ ‘যুখাশার’ নামক স্থানে অবস্থান গ্রহণ করে, এক

(ছত্রিশ)

ভাগ ‘আওয়াস’ নামক স্থানে অবস্থান গ্রহণ করে, আর এক ভাগ মদিনায় এসে ওসমান ইবনে আফফানের বাড়ীর অদূরে অবস্থান নেয়।

যিয়াদ ইবনে মুনযির এবং আব্দুল্লাহ ইবনে আসেম মদিনায় ওসমান ইবনে আফফানের বাড়ীর নিকটে অবস্থানকারী দলের নেতৃত্ব দেয়। তারা মদিনার অধিবাসী হতে যারা ওসমান ইবনে আফফানের বিরোধী তাঁদেরকে একত্রিত করতে থাকে। আয়েশা বিনতে আবু বকরের সমর্থকেরা এই দলকে সার্বিক সহযোগিতা করতে থাকে এবং আয়েশা বিনতে আবু বকরের ভাই আব্দুর রহমান ইবনে আবু বকর ওসমান বিষয়ে সকল তথ্য সংগ্রহে ইবনে মুনযির ও ইবনে আসেমকে সহযোগিতা করতে থাকে।

মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান নিশ্চিত ভাবে জানতো যে, কুফা, বসরা ও মিশর থেকে পাঠানো তিন হাজার লোক কেন, দশ হাজার লোক গেলেও মদিনা শরীফে ওসমান ইবনে আফফানের পক্ষের লোকের সাথে যুদ্ধে জয়লাভ সম্ভব হবে না। তাই সে আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা’র স্বাক্ষর নকল করে মদিনার গন্যমান্য ব্যক্তিবর্গকে চিঠি প্রেরণ করে যে,

প্রিয় মদিনাবাসী,

আমি আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা পত্র মারফত আপনাদিগকে অবহিত করাতে চাই যে, মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান এবারের হজ্জের মৌসুমে ওসমান ইবনে আফফানকে ক্ষমতাচ্যুত অথবা হত্যা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এবার হজ্জের সময় মদিনায় এক রক্তারক্তি অবস্থার সৃষ্টি হবে। তাই আমি বসরা, কুফা ও মিশর হতে এক হাজার করে সৈন্য প্রেরণ করলাম। তারা হজ্জ পালনকারী হিসাবে মদিনায় যাবে এবং অবস্থান করবে। তারা যেন সেখানে নিরাপদে থাকতে পারে এ বিষয়ে মদিনাবাসীরা যেন তাঁদেরকে সাহায্য সহযোগিতা করে।

আমি মনে করি, হজ্জের সময় যখন মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান ওসমান ইবনে আফফানের বিরুদ্ধে অবস্থান নেবে, তখন আমার পাঠানো লোকজন ওসমান ইবনে আফফানের পক্ষে কাজ করবে ও তাঁকে ক্ষমতাচ্যুত অথবা হত্যা করা হতে রক্ষা করবে।

আমি এই মর্মে সতর্ক করছি যে, মদিনার গন্যমান্য ব্যক্তিরা যেন কোন অবস্থাতেই বসরা, কুফা ও মিসর হতে আগত লোকদিগের সাথে যাতায়াত ও সম্পর্কহীন ভাবে চলাফেরা করে। তা না হলে মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ানের লোকেরা আগত লোকদিগের বিষয়ে সন্দেহ পোষণ করবে। তাতে করে মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান মদিনা অক্রমনের বিষয়ে বর্তমান পরিকল্পনা পরিবর্তন করে, ভিন্ন

(সাইত্রিশ)

পরিকল্পনা গ্রহণ করতে পারে। তাতে করে মদিনা শরীফে অনেক বেশি রক্তারক্তি হবে ও ওসমান ইবনে আফফানকে রক্ষা করা কঠিন হয়ে যাবে।

ইতি

আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা

মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান কর্তৃক আব্দুল্লাহ ইবনে সাবার নকল স্বাক্ষরিত চিঠি প্রাপ্ত হবার পরে, মদিনার গন্যমান্য ব্যক্তিবর্গ বসরা, কুফা ও মিসর হতে আগত লোকেদের বিষয়ে নিরব ভূমিকা পালন করতে থাকে। অন্যথায় এই তিন হাজার লোকের কি করে দুঃসাহস হতে পারে যে, যেখানে মদিনা শরীফে আহযাব যুদ্ধকালে বিরাট কাফিরের দল কোন সুবিধা করে উঠতে পারেনি, সেখানে তারা নিজেদের একটি অতি ঝুঁকিপূর্ণ উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য মদিনা শরীফে এসে অবস্থান নিতে পারে? বরং এই ভরসায় তারা বুক উঁচিয়ে মদিনা শরীফ অভিমুখে রওয়ানা হয়েছিলো যে, মদিনা শরীফের গন্যমান্য সকল লোকই তো আমাদিগকে তাঁদের পক্ষের লোক বিশ্বাসে বিরধিতার পরিবর্তে সাহায্য সহযোগিতা করবে।

এদিকে আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা যখন জানতে পারে যে, তাঁর স্বাক্ষরিত বেশ কিছু চিঠি মদিনার গন্যমান্য ব্যক্তিবর্গ প্রাপ্ত হয়েছে। যে চিঠিতে লেখা রয়েছে যে, হজ্জের সময় মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান কর্তৃক লোকজন মদিনা আক্রমণ করবে এবং ওসমান ইবনে আফফানকে ক্ষমাচ্যুত অথবা হত্যা করবে, তাই আমি বসরা, কুফা ও মিসর থেকে এক হাজার করে লোক প্রেরণ করলাম, তারা মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ানের লোকের বিপক্ষে প্রতিরোধ করবে, এবং তাঁদেরকে যেন মদিনায় প্রবেশ ও অবস্থানে কোন বাধা প্রদান না করা হয় এবং ইতিমধ্যে বসরা, কুফা ও মিশর থেকে মদিনা শরীফে তিন হাজার লোক গিয়ে অবস্থান করছে।

তখন আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা আলী ইবনে আবু তালিবকে জরুরী পত্র প্রেরণ করে যে, সে কুফা, বসরা ও মিসর থেকে লোক প্রেরণের বিষয়ে মদিনার গন্যমান্য ব্যক্তিবর্গের কাছে কোন চিঠি প্রেরণ করে নাই। যেহেতু সে চিঠিতে আমার স্বাক্ষর রয়েছে, তাই আমি মনে করি যে, মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান কর্তৃক আমার স্বাক্ষর নকল করে এই চিঠি প্রেরণ করা হয়েছে। এতে করে আমি নিশ্চিত যে, বর্তমানে মদিনা শহরে কুফা, বসরা ও মিসর হতে যাওয়া যে সকল লোক অবস্থান করছে, তারা মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ানের দলের লোক। তারা মদিনা শহর আক্রমণ ও ওসমানকে হত্যা করবে, তাই যত দ্রুত সম্ভব মদিনার গন্যমান্য ব্যক্তিবর্গকে সঙ্গে নিয়ে বাহির হতে যে সকল লোক মদিনায় অবস্থান করছে তাঁদেরকে যেন বিতাড়িত করা হয়।

(আটত্রিশ)

মদিনার গন্যমান্য ও নেতৃস্থানীয় লোকজন আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা’র স্বাক্ষরিত প্রথম চিঠি পাওয়ার পরে বসরা, কুফা ও মিসর থেকে আগত লোকদের আগমনের কারণ জিজ্ঞাসা না করেই, আন্তরিক সহযোগিতা দেখিয়ে আসছিল। কিন্তু পরবর্তীতে আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা’র চিঠি প্রাপ্তির পরে, মদিনাবাসীরা যখন জানতে পারে যে, আগত লোকদের ব্যপারে আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা কিছুই অবগত নাই, তখন আলী ইবনে আবু তালিব সহ মদিনার গন্যমান্য ব্যক্তিরা আগতদের কাছে তাঁদের আগমনের কারণ জানতে চাইলে, তারা বলে আমরা হজ্জের উদ্দেশ্যে এসেছি, এখানে শুধু মাত্র যাত্রা বিরতির জন্যই অবস্থান করছি। তখন মদিনার গন্যমান্য ব্যক্তিরা আগত লোকদের বলে যে, আমাদের খলীফা নিয়ে অন্তরকলহ চলছে, তাই আমরা মনে করছি তোমাদের এতো লোক এখন মদিনায় থাকা যাবে না, যেহেতু তোমরা হজ্জের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়েছ, তাই তোমরা আগামী কাল মদিনা থেকে মক্কার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করবে। আলী ইবনে আবু তালিব ও মদিনার গন্যমান্য ব্যক্তিদের এই কথার প্রেক্ষিতে আগত লোকজন পরদিন মদিনা শরীফ থেকে মক্কার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে।

বসরা, কুফা ও মিশর হতে আগত লোকেরা মদিনা থেকে মক্কার উদ্দেশ্য যাত্রা শুরুর পঞ্চম দিন, অর্থাৎ ৩৫ হিজরি সনের ১৬ই যিলকদ পুনরায় সকলে একজোট হয়ে, এবং আগের তুলনায় অধিক লোক নিয়ে মদিনায় ফিরে এসে আব্দুল্লাহ ইবনে সাদ’ এর নেতৃত্বে ওসমান ইবনে আফফানের বাসগৃহ ঘিরে ফেলে বিক্ষোভ শুরু করে। তারা একটি চিঠি দেখিয়ে দাবী করে যে, ওসমান ইবনে আফফান এই চিঠি আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা’র অনুসারী মিশরের কোন এক নেতার কাছে পাঠানো হয়েছে, যা আমরা ওসমান ইবনে আফফানের এক ভৃত্যের নিকট থেকে উদ্ধার করেছি। যে, চিঠিতে লেখা রয়েছে, আমরা মিশরে প্রবেশ করলেই যেন মিশরের আব্দুল্লাহ ইবনে সাবার লোকেরা আমাদিগকে হত্যা করে ফেলে। তাই তারা মুহুর্মুহু তাকবির ধ্বনি করতে থাকে যে, এই মুহূর্তে ওসমান ইবনে আফফানকে পদত্যাগ করতে হবে, নয় তাঁকে আমরা হত্যা করবো।

কুফা ও বসরার বিক্ষোভকারীরা বিক্ষোভের কারণ হিসাবে বলে যে, যেহেতু আমরা আমদের মিশরীয় ভাইদের সুখ ও দুঃখের অংশীদার থাকতে চাই, তাই আমরাও তাঁদের সাথে ফিরে এসেছি ও বিক্ষোভে অংশ নিয়েছি। মিশরবাসীর মতো আমরাও ওসমান ইবনে আফফানের পদত্যাগ চাই, নইলে তাঁকে আমরা হত্যা করবো।

আলী ইবনে আবু তালিব বলে যে, এটা তোমাদের একটা ষড়যন্ত্র ছাড়া কিছুই না, আমি মনে করি এটা তোমাদের পূর্ব পরিকল্পিত বিষয়। যুদ্ধে কোন সমস্যার সমাধান হবে না। এসো আমরা আলোচনার মাধ্যমে এর মীমাংসা করার চেষ্টা করি। আর তথ্য উদ্ধার করার চেষ্টা করি যে, তোমাদের

(ঊনচল্লিশ)

কাছে থাকা চিঠির উৎস কি। কিন্তু বিক্ষোভকারীরা কোন আলোচনায় রাজী না হয়ে এক দাবিতে অনড় হয় যে, যে কোন মুল্যে আমরা এই খলীফাকে ক্ষমতাচ্যুত করবো।

বিক্ষোভকারীরা মদিনা শহরের অলি গলিতে অবস্থান নিয়ে ওসমান ইবনে আফফানকে একেবারে অবরুদ্ধ করে ফেলে, এবং মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ানের নির্দেশে রাষ্ট্রের সকল সৈন্য বাহিনী নিরব ভূমিকা পালন করে।


১। আলোচনা করে জ্ঞানীগণ, ঝগড়া করে অজ্ঞানীগণ ও মারামারি করে পশুগণ। সেরু পাগলার বাণী।

২। স্বার্থ সিদ্ধির জন্য নেওয়া ছলনাময়ী আশ্রয়টুকুর নামই, প্রেম বা ভালবাসা। সেরু পাগলার বাণী।

৩। যাহার চিন্তা বাক্য ও কর্ম, নিজের, সমাজের, দেশের তথা বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষে নিযোজিত, সেই ইসলাম বা শান্তি ধর্মের লোক। তা সে যে সম্প্রদায়েরই হউক না কেন। আর- যাহার চিন্তা বাক্য ও কর্ম, নিজের, সমাজের, দেশের তথা বিশ্ব অ-শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষে নিযোজিত, সেই অ-ইসলাম বা অ-শান্তি ধর্মের লোক। তা সে যে সম্প্রদায়েরই হউক না কেন। সেরু পাগলার বাণী।

৪। আস্তিক হলো তারাই- যারা বিশ্বাস করে আল্লাহর অস্তিত্ব আছে। আল্লাহ দেহধারী, তাকে দেখা যায় ও তাকে ধরা যায়।
নাস্তিক হলো তারা- যারা মনে করে আল্লাহ নিরাকার, তাকে দেখা ও ধরা যায় না।
আর যারা বিশ্বাস করে স্রষ্টা বলতে কিছু নাই, তারা মূলতঃ ভণ্ড। সেরু পাগলার বাণী।।

(37) বার পঠিত

2 Responses

  • শুক্রধর

    গুরুজী, যেহেতু এইগুলো ইতিহাস গত বর্ননা, সো নিশ্চয়ই এর রেফারেন্স থাকবে ꫰ সো এগুলোর রেফারেন্স দিলে ভাল হত ꫰

    • গুরুজি

      রেফারেন্স হলো প্রচলিত কোরআন। সঠিক ভাবে প্রচলিত কোরআন জানার চেষ্টা করুন, তাহলেই সবকিছু পরিস্কার ভাবে জানতে পারবেন।

Leave a Reply