ওসমান ইবনে আফফানের খলীফা গ্রহণকালে প্রাদেশিক ক্ষমতায় ছিলেন-

১। মক্কা- নাফি ইবনে আব্দুল্লাহ হারাস  ২। তায়িফ- সুফিয়ান ইবনে আব্দুল্লাহ সাকাবি  ৩। ইয়ামেন- ইয়ালা ইবনে উমাইয়া  ৪। আম্মান- হুযাইফা ইবনে মুহসিন  ৫। দামেশক- মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান  ৬। মিসর- আমর ইবনে আস  ৭। হিমস- উমর ইবনে সায়াদ  ৮। জরদান- উমর ইবনে উতবা  ৯। বসরা- আবু মুসা আশয়ারি  ১০। কুফা- মুগিরা ইবনে শু’বা  ১১। বাহরাইন- উসমান ইবনে আবুল আস

অর্থাৎ প্রতিটি প্রদেশেরই প্রাদেশিক ক্ষমতায় ছিল ইসলামের শত্রু মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ানের পক্ষের লোকেরা। হিজরি ২৭ সনে মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান ধীরে ধীরে সমগ্র সিরিয়ার শাসন ক্ষমতা করায়ত্ত করে নেয়।

হিজরি ৩০ সনে ওসমান ইবনে আফফান প্রচলিত কোরআনকে গ্রন্থ আকারে প্রকাশের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। তখন প্রচলিত কোরআন গ্রন্থ আকারে প্রকাশ নিয়ে মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান ও আয়েশা, এবং আলী ইবনে আবি তালিব ও ওসমান ইবনে আফফানের মধ্যে মতবিরোধ সৃষ্টি হয়। আলী ইবনে আবি তালিব ও ওসমান ইবনে আফফান চাই বর্তমানে প্রচলিত কোরআনে থাকা আট হাজার আয়াত সমৃদ্ধ গ্রন্থ প্রকাশ করা ও সেই গ্রন্থে উল্লেখ রাখতে চাই যে, মোহাম্মদ ইন্তেকালের সময় প্রচলিত কোরআনের আয়াত সংখ্যা প্রায় আঠারো হাজার ছিল, কিন্তু কীভাবে, কাহারা ও কেন সেই প্রচলিত কোরআন থেকে প্রায় দশ হাজার আয়াত কমিয়ে প্রায় আট হাজার আয়াতে পরিণত করলো। অপরদিকে মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান ও আয়েশা বিনতে আবু বকর চাই, বর্তমান আট হাজার আয়াত সমৃদ্ধ প্রচলিত কোরআন থেকে গুরুবাদের করণ বিষয়ে যে সকল ব্যাক্ষ্যা সমূহ রয়েছে, সে আয়াত সমূহ প্রচলিত কোরআন থেকে বাদ দিয়ে গ্রন্থ আকারে প্রকাশ করতে। সেই

(ঊনত্রিশ)

সাথে তারা চাই যে, কোন অবস্থাতেই প্রচলিত কোরআনে উল্লেখ করা যাবে না যে, মোহাম্মদ ইন্তেকালের সময় প্রচলিত কোরআনের আয়াত প্রায় আঠারো হাজার ছিল ও কাহারা, কীভাবে ও কেন আয়াত সমূহ কমানো হয়েছে। ৩০ হিজরি সনে প্রচলিত কোরআন গ্রন্থ আকারে প্রকাশে আয়াত সংখ্যা নির্ধারণ নিয়ে মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান ও আয়েশা বিনতে আবু বকর এবং ওসমান ইবনে আফফান ও আলী ইবনে আবি তালিবের সাথে প্রকাশ্য বিরোধের সৃষ্টি হয়।

আব্দুর রহমান ইবনে আওফ মুসলমানদের প্রতিপক্ষ উমাইয়া ইবনে খালাফের বন্ধু ছিলেন। মদিনায় হিজরতের পর তারা দু’জন একটি চুক্তি করেন। যার আওতায় আব্দুর রহমান মদিনায় উমাইয়া ইবনে খালাফের সম্পদ ও পরিবারকে রক্ষা করবে, এবং অন্যদিকে উমাইয়া ইবনে খালাফ মক্কায় থাকা আব্দুর রহমান ইবনে আওফের স্থাবর অস্থাবর সম্পদ ও পরিবারকে রক্ষা করবে। ইসলাম গ্রহণের পূর্বে তাঁর নাম ছিল “আব্দুল আমর”। আব্দুর রহমান ইবনে আওফ ছিল একজন সুযোগ সন্ধানী মানুষ। ইসলাম গ্রহণকালে তাঁর অর্থনৈতিক অবস্থা ছিল একেবারেই নিম্ন পর্যায়ে। মূলত সে ছিল গরীব মানুষদের আওতাভুক্ত। কিন্তু এই আব্দুর রহমান ইবনে আওফ হিজরি ৩২ সনে ৭২ বৎসর বয়সে, অন্য মতে ৭৫ বৎসর বয়সে অনেক সম্পদ রেখে বার্ধক্য জনিত রোগে মৃত্যু বরণ করেন।

আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা সানা শহরের অধিবাসী ছিলেন। তিনি আলী ইবনে আবি তালিবের কাছ থেকে দীক্ষা প্রাপ্ত। তিনি প্রচলিত কোরআনের ১৮ হাজার আয়াতের পুরোটাই আলী ইবনে আবি তালিবের নিকট হতে পাঠ করেছিলেন। ওসমানের শাসন আমলে সে মদিনায় স্থায়ী বসবাস শুরু করে। ইসলামের প্রথম খলীফা যে আলী ইবনে আবি তালিব তা তিনি প্রকাশ্যে প্রচার শুরু করেন। তিনি প্রচার করেন যে, রাজ্যের খলীফা হিসাবে তোমরা যে কাউকে মানতে পারো, তাতে কোন আপত্তি নাই। কিন্তু প্রচলিত কোরআনের দৃষ্টিতে ইসলামের প্রথম খলীফা আলী ইবনে আবি তালিব।

মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান মনে করেন যে ওসমানই আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা কে প্রশ্রয় দিয়ে এ সকল বিষয় প্রচারে সাহায্য করছে। তাই মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান, ওসমান ইবনে আফফানের উপর ক্রুদ্ধ হয় ও আব্দুল্লাহ ইবনে সাবাকে হত্যা করার জন্য নির্দেশ দেয়। পরিস্থিতি প্রতিকুল দেখে আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা কুফায় স্থানান্তরিত হয়। যেখানে পূর্ব থেকেই সকল অধিবাসী পূর্ণাঙ্গ প্রচলিত কোরআন অর্থাৎ আঠারো হাজার আয়াত সমৃদ্ধ প্রচলিত কোরআনকে জানতো, ও সে মতোই বিশ্বাস করতো।

১৮ হাজার আয়াত সমৃদ্ধ প্রচলিত কোরআনের জ্ঞান সমৃদ্ধ সাহাবা মালিক আশতারকে কুফার দায়িত্বে রেখে, আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা সিরিয়া গমন করেন ১৮ হাজার আয়াত সমৃদ্ধ প্রচলিত কোরআনের

(ত্রিশ)

বিষয় প্রচার করার উদ্দেশ্যে। সিরিয়ায় প্রচার করার পরে তিনি মিশরে চলে যান। তবে তিনি যেখানেই গিয়েছেন সেখানেই অধিকাংশ মানুষ পূর্ব থেকেই ১৮ হাজার আয়াত সমৃদ্ধ প্রচলিত কোরআনের বিষয়ে বিশ্বাস স্থাপন করতো। মিশরে অবস্থান করেই আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা ১৮ হাজার আয়াত সমৃদ্ধ প্রচলিত কোরআন গ্রন্থ আকারে প্রকাশের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। আর প্রচলিত কোরআনের দৃষ্টিতে ইসলামের প্রথম খলীফা যে আলী অধিকাংশ মুসলমানেরা তখন পর্যন্ত তা বিশ্বাস করতে থাকে।

আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা মিশরে অবস্থান করে বসরা, কুফা সহ সকল মুসলিম দেশে পত্র মারফৎ ১৮ হাজার আয়াত সমৃদ্ধ প্রচলিত কোরআনের বিষয়ে সকল গোত্র প্রধানদের অবগত করাতে থাকে। এতে করে মুসলিম দেশসমূহের অধিকাংশ গোত্র প্রধানেরা ১৮ হাজার আয়াত সমৃদ্ধ কোরআনের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে, এবং তাঁরা বুঝতে পারে যে, বর্তমানে মুসলিম দেশ সমূহে যারা শাসন ক্ষমতায় আছে, তারা কেউই মোহাম্মদের আদর্শের নয়, তারা সকলেই পূর্ব থেকে চলে আসা কুসংস্কারে ঘেরা অন্ধ বিশ্বাসী দলের আওতাভুক্ত।

আলী ইবনে আবি তালিবের দলের প্রচারে প্রসার দেখে মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান দুশ্চিন্তায় পড়ে যায় যে- হয়তো বা তাঁরা আলী ইবনে আবি তালিবের দলের কাছে পরাজিত হয়ে যাবে। এই আশংকায় মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান আরও শঙ্কিত হয়ে পড়ে। তবে এতো কিছুর পরেও ওসমান ইবনে আফফান নিরব ভুমিকা পালন করছেন দেখে, মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান ওসমান ইবনে আফফানের উপর ক্রুদ্ধ হন। তাই, মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান মিশর থেকে আব্দুল্লাহ ইবনে সাইদ ইবনে আবু সারাহ কে, কুফা থেকে সাইদ ইবনে আস কে, বসরা থেকে আব্দুল্লাহ ইবনে আমেরকে নির্দেশ দেয় যে, তাঁদের মতাবলম্বী গোত্র নেতাদের নিয়ে ওসমানের কাছে উপস্থিত হয়ে, আব্দুল্লাহ ইবনে সাবার আঠারো হাজার আয়াত সমৃদ্ধ প্রচলিত কোরআন প্রচার বিষয়ে নিরব থাকার কারণ সম্পর্কে ব্যাখ্যা চাইতে। সেই সাথে মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান সিরিয়া থেকে নির্দিষ্ট দিনে ওসমান ইবনে আফফানের কাছে উপস্থিত হবেন ও আব্দুল্লাহ ইবনে সাবার ১৮ হাজার আয়াত সমৃদ্ধ প্রচলিত কোরআনের প্রচার বিষয়ে তিনি নিরব কেন তা জানতে চাইবেন বলে সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেন।

নির্দিষ্ট দিনে সকলে উপস্থিত হয়ে ওসমান ইবনে আফফানের কাছে জানতে চাই যে, আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা ১৮ হাজার আয়াত সমৃদ্ধ প্রচলিত কোরআনের প্রচার বিষয়ে, এবং আলী ইবনে আবি তালিব প্রায় আট হাজার আয়াত সমৃদ্ধ প্রচলিত কোরআন গ্রন্থ আকারে প্রকাশ করতে চাই, ও সেই গ্রন্থে ১৮ হাজার আয়াত থেকে কি কারণে ও কিভাবে আট হাজার আয়াতের প্রচলিত কোরআনে রূপান্তর হলো তা উল্লেখ রাখতে চাই, এ বিষয় জানার পরেও আপনি নিরব কেন? সেই সাথে তারা ওসমান ইবনে

(একত্রিশ)

আফফানকে জোর চাপ দিতে থাকে যে, যারা আলী ইবনে আবি তালিবের পক্ষে প্রচার করছে তাদেরকে মুরতাদ ঘোষণা করে ধরে ধরে হত্যা করার নির্দেশ প্রদান করতে। কিন্তু ওসমান তাঁদের কথায় রাজী না হয়ে বলেন যে, প্রচলিত কোরআন বিরোধী সুনির্দিষ্ট কোন প্রমাণ না পাওয়া পর্যন্ত সে

কাউকে মুরতাদ ঘোষণা করে হত্যার অনুমতি দেবে না। তখন মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান ওসমান ইবনে আফফানের বিরুদ্ধে যে মানুষেরা বিক্ষোভ করছে তা উপস্থাপন করলে, ওসমান পরিস্কার জানিয়ে দেয় যে, আমার বিরুদ্ধে যাহা কিছু হচ্ছে তা সামাল দেওয়ার মতো মনোবল ও সামরিক শক্তি আমার আছে। পরিশেষে কোন সিদ্ধান্ত ছাড়াই তাঁদের এই আলোচনা শেষ হয়।

৩৪ হিজরি সনে যখন সমগ্র মুসলিম দেশের অধিকাংশ মুসলমান আলী ইবনে আবি তালিবকে ইসলামের প্রথম খলীফা হিসাবে মান্য করে নিয়ে তাঁর নির্দেশ পালন করতে থাকে, এবং আলী ইবনে আবি তালিব পন্থিরা উমাইয়া পরিবার কর্তৃক নিয়োগকৃত সকল শাসককে প্রত্যাহার ও ক্ষমতাচ্যুত করে ইসলামী আইন বাস্তবায়নের জন্য ১৮ হাজার আয়াত সংবলিত প্রচলিত কোরআনকে প্রতিষ্ঠিত করতে ঐক্যবদ্ধ হন। আর ওসমান ইবনে আফফান সব জানার পরেও নিরব ভুমিকা পালনের জন্য মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ানসহ উমাইয়া পরিবার কর্তৃক নিয়োগকৃত শাসকগণ ও মোহাম্মদের দেওয়া ইসলামের আইন বিরোধীরা ওসমান ইবনে আফফানের প্রতি বিশ্বাস হারাতে থাকে। তাই তাঁরা সিদ্ধান্ত নেয় যে, যে কোন মুল্যে ওসমানকে ক্ষমতাচ্যুত করতে হবে। আর সেই সূত্র ধরেই হজ্জ সমাপন করে মদিনায় একত্রিত হয়ে আলী ইবনে আবি তালিব, তালহা ইবনে উবাইদুল্লাহ, যুবায়ের ও ওসমান ইবনে আফফানের উপস্থিতিতে, ইসলাম বিরোধীরা একত্রিত হয়ে এক জনসভায় মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান ঘোষণা করে যে, ওসমান ইবনে আফফান এখন বৃদ্ধ হয়ে গেছেন, তিনি এখন বুদ্ধিমত্তার সাথে সকল বিষয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে ক্ষমতা রাখে না। বর্তমানে তাঁর সম্পর্কে মানুষের মুখে মুখে নানা ধরণের কথাবার্তা শোনা যায়। যার সকল কিছুই তাঁর বিরুদ্ধে যায়। তাতে প্রায় সকল মুসলমানই তাঁকে আর খলীফা পদে দেখতে চাই না। তাই আমি সকলের মতামত নিয়ে বলছি যে, এই বয়সে তাঁর খলীফার পদ আঁকড়ে ধরে রাখা উচিৎ হবে না। তাই এই মজলিসে তিনি যেন খলীফার পদ থেকে সরে দাঁড়ান। আর এই মজলিসেই আমরা নতুন খলীফা নির্বাচন করবো।

মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ানের ঘোষণা শুনে আলী ইবনে আবি তালিব দাঁড়িয়ে যায়, এবং মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ানকে তাঁর কথা প্রত্যাহার করে নিতে অনুরোধ করেন। আলী ইবনে আবি তালিব বলেন, সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান ওসমান ইবনে আফফানকে খলীফা হিসাবে দেখতে চাই না, এটা আপনি কীভাবে নির্ধারণ করলেন। আমরা মনে করি যে, সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম ওসমান ইবনে আফফানকেই খলীফা হিসাবে দেখতে চাই এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান ওসমানের নেওয়া সকল

(বত্রিশ)

সিদ্ধান্তে একমত ও খুশি। তাই অনতিবিলম্বে মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ানকে তাঁর বক্তব্য প্রত্যাহারকরে নিতে হবে বলে ভরা মজলিশে আলী ইবনে আবি তালিব প্রকাশ্য ঘোষণা করেন।

এর পরে ওসমান ইবনে আফফান দাঁড়িয়ে সকল মুসলমানের উদ্দেশ্যে বলেন যে, অপ্রিয় হলেও সত্য এই যে, শুধু মাত্র ক্ষমতার লোভে আবু বকর ও ওমোর ইবনে খাত্তাব ইসলামের যে ক্ষতি সাধন করেছে, তা যদি আমাদের জীবদ্দশায়, অর্থাৎ সাহাবীদের জীবদ্দশায় সংশোধন করে না যেতে পারি, তাহলে অদূর ভবিষ্যতে ধীরে ধীরে ইসলামের সকল আইন বিলুপ্ত হয়ে, পূর্ব থেকে চলে আসা কুসংস্কার ও অন্ধ বিশ্বাসে ঘেরা আইন প্রতিষ্ঠা পাবে। আমি বিশ্বাস করি, আমি খলীফা পদে অধিষ্ঠিত হয়ে আজ পর্যন্ত যতো সিদ্ধান্ত নিয়েছি, তাঁর সবগুলি সিদ্ধান্তেই মুসলমানেরা আমার সাথে একমত। কেবলমাত্র তারাই আমার নেওয়া সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করছে, যারা ইসলাম বিরোধী, যারা প্রচলিত কোরআনের আইন বিরোধী ইসলামে অনুপ্রবেশকারী। মোহাম্মদের হাতে হাত দিয়ে বাইয়াত গ্রহণকারী কেও যদি বলতে পারে যে, আমি ওসমান ইসলামের বিরুদ্ধে একটি মাত্র সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছি, তাহলে আমি এই মুহূর্তে খলীফার পদ থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নিবো।

তখন সিরিয়ার অধিবাসী এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে বলেন যে, আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা আঠারো হাজার আয়াত সমৃদ্ধ যে প্রচলিত কোরআনের কথা প্রচার করছে, তা আপনি সঠিক বলে মনে করেন কি না? তখন ওসমান বলে হ্যাঁ, আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা প্রচলিত কোরআন বিষয়ে যাহা প্রচার করছে,  এর সকল কথাকে আমি সত্য বলে মনে করি।

তখন মিশরের অধিবাসী আরেকজন দাঁড়িয়ে প্রশ্ন রাখে যে, আপনি আপনার বক্তব্যে বলেছেন, ক্ষমতার লোভে আবু বকর ও ওমোর ইবনে খাত্তাব ইসলামের অনেক বড় ক্ষতি সাধন করেছে। এটা আপনি কোন যুক্তির উপরে বলেছেন?

তখন ওসমান তাঁকে পাল্টা প্রশ্ন করেন যে, তুমি কি মোহাম্মদের হাতে হাত রেখে বাইয়াত গ্রহণ করেছিলে? সে জবাব দিলো না। তখন ওসমান তাঁকে আবার প্রশ্ন করে, মোহাম্মদ মারা যাওয়ার পরে ইসলামের প্রথম খলীফা নির্বাচনের সময় তুমি উপস্থিত ছিলে কি? সে বলে না। তখন ওসমান প্রশ্নকারীকে বলে যে, যারা মোহাম্মদের হাতে হাত রেখে বাইয়াত গ্রহণ করেছে ও মোহাম্মদ মৃত্যুর পরে ইসলামের প্রথম খলীফা নির্বাচনের সময় উপস্থিত ছিল, তাঁদের সাথে আলোচনা করো। তাহলেই জানতে পারবে যে, আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা যাহা বলছে, তাহা সত্য না মিথ্যা।

তখন মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান বলে যে, প্রচলিত কোরআনের দৃষ্টিতে আপনার খলীফা গ্রহণকে আপনি সঠিক বলে মনে করেন কি না? জবাবে ওসমান বলে, না! প্রচলিত কোরআনের দৃষ্টিতে

(তেত্রিশ)

আমার খলীফা গ্রহণ সঠিক নয়। তখন মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান বলে যে, তাহলে একজন বেঠিক খলীফার মতামতের কোন মূল্য থাকতে পারে না। তাই আমরা আপনার কোন কথাকেই আর গ্রহণ করতে রাজী নই। অনতিবিলম্বে আমরা একজন সঠিক খলীফা নির্বাচিত করে, তাঁর সিদ্ধান্ত মতোই চলার চেষ্টা করবো। তাহলে আর এই সভার কোন মানে হয় না। এই সভা এখানেই স্থগিত করা হলো।

এরপরে যেসব প্রদেশ থেকে কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা মদিনায় এসেছিলো তাঁরা একে একে নিজ নিজ কর্মস্থলের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়ে গেলে মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান ওসমানের কাছে এসে বলে যে, এই সভাতে আপনি যে ধরণের বক্তব্য রেখেছেন, তাতে করে আমি ধারণা করছি যে, মদিনা আপনার জন্য নিরাপদ নয়। আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা এর বিপক্ষের লোকেরা যে কোন মুহূর্তে আপনাকে আক্রমণ করতে পারে। তাই আপনি আমার সাথে সিরিয়া চলেন। সেখানে আপনি নিরাপদে থাকতে পারবেন।

মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ানের কথার জবাবে ওসমান ইবনে আফফান বলে, যে আমাকে খলীফার অযোগ্য মনে করে, তাঁকে বিশ্বাস করে তাঁর আশ্রয়ে থাকার চেয়ে, মদিনা ই আমার জন্য নিরাপদ। তখন মুয়াবিয়া বলে, আপনি চাইলে আপনার নিরাপত্তার জন্য,  আমি সিরিয়া থেকে সৈন্য পাঠাতে রাজী আছি। ওসমান বলে তাঁর আর দরকার হবে না। মদিনার সৈন্য দিয়েই আমার নিরাপত্তা রক্ষিত হবে। সিরিয়ার সৈন্য মদিনায় এনে আমি মদিনাবাসীকে বিরক্ত করতে চাই না। তখন মুয়াবিয়া বলে যে, আপনি যাদের বিশ্বাস করছেন, তাঁদের দ্বারাই আপনার ক্ষতি সাধন হবে বলে আমি মনে করছি। তখন ওসমান বলে যে, আল্লাহ্‌ই আমার জন্য যথেষ্ট, এবং তিনিই আমাকে রক্ষা করবেন।

তখন মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান, আলী ইবনে আবি তালিব, তালহা ইবনে উবাইদুল্লাহ ও যুবায়েরকে বলে যে, আপনারা ওসমানকে যে পথে পরিচালিত করছেন, তাতে শুধু ওসমানেরই ক্ষতি হবে না, আপনারাও বিপদের সম্মুখীন হবেন এটা আমি স্মরণ করিয়ে দিলাম। এরপরে মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ান সিরিয়ার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়ে যায়।


১। আলোচনা করে জ্ঞানীগণ, ঝগড়া করে অজ্ঞানীগণ ও মারামারি করে পশুগণ। সেরু পাগলার বাণী।

২। স্বার্থ সিদ্ধির জন্য নেওয়া ছলনাময়ী আশ্রয়টুকুর নামই, প্রেম বা ভালবাসা। সেরু পাগলার বাণী।

৩। যাহার চিন্তা বাক্য ও কর্ম, নিজের, সমাজের, দেশের তথা বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষে নিযোজিত, সেই ইসলাম বা শান্তি ধর্মের লোক। তা সে যে সম্প্রদায়েরই হউক না কেন। আর- যাহার চিন্তা বাক্য ও কর্ম, নিজের, সমাজের, দেশের তথা বিশ্ব অ-শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষে নিযোজিত, সেই অ-ইসলাম বা অ-শান্তি ধর্মের লোক। তা সে যে সম্প্রদায়েরই হউক না কেন। সেরু পাগলার বাণী।

৪। আস্তিক হলো তারাই- যারা বিশ্বাস করে আল্লাহর অস্তিত্ব আছে। আল্লাহ দেহধারী, তাকে দেখা যায় ও তাকে ধরা যায়।
নাস্তিক হলো তারা- যারা মনে করে আল্লাহ নিরাকার, তাকে দেখা ও ধরা যায় না।
আর যারা বিশ্বাস করে স্রষ্টা বলতে কিছু নাই, তারা মূলতঃ ভণ্ড। সেরু পাগলার বাণী।।

(155) বার পঠিত

14 Responses

  • আবু সাইদ

    অসাধারণ উপস্থাপনা,পড়ার সময় অনুভব হয়েছে বিশ্বজগত স্থির হয়ে গেছে।

    • গুরুজি

      লেখাটি পড়া ও মন্তব্যের জন্য অনেক অনেক ধন্যবাদ।

      মূলতঃ ইসলামের আসল ইতিহাস অনেক বড় লোমহর্ষক কাহিনী ও অনেক বড় বেদনা বিজড়িত। তাই ভিন্ন অনুভূতি হওয়াটাই স্বাভাবিক। প্রকৃত মুসলমান হলে এই লুকায়িত ইতিহাস তাঁর হৃদয়ে নাড়া না দিয়ে পারে না।

      • আবু সাইদ

        আপনাকেও অনেক অনেক অভিনন্দন।।অযতনে ডুবলো বেলা,ত্বরাও গুরু নিজ গুনে।আজ আমার কেউ নাই গুরু,তুমি বিনে।

        • গুরুজি

          প্রভু চাইলে সেপ্টেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে প্রচলিত কোরআনের সূরাত ও আয়াতের বাংলা অনুবাদ ও ব্যাখ্যা উপস্থাপন করতে পারবো বলে মনে করছি।

  • মাসুম

    খুব ভাল লাগলো গুরুজী

    • গুরুজি

      পোষ্ট পড়া ও মন্তব্যের জন্য অনেক অনেক ধন্যবাদ।

      লেখা ভালো লাগার জন্য কৃতজ্ঞ।

      • মাসুম

        গুরুজী নিবন্ধন ফরম পূরন করে পাঠিয়েছি।।

        • গুরুজি

          ঠিক আছে। ৬/৭ তারিখের মধ্যে ফিরতি বার্তা পাবেন বলে আমি মনে করি।

  • মাসুম

    সালাম গুরুজী,

    আপনার বার্তা পেয়েছি, আপনার বার্তার উত্তরও দিয়েছি,,

    ধন্যবাদ

    • গুরুজি

      উত্তর প্রদানের জন্য অনেক অনেক ধন্যবাদ।

  • he3ra

    গুরু জী অাপনার রচিত বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় ইসলাম মোট কত পর্ব । সেই লেখা গুলো কি এখানে পোষ্ট করা হয়েছে না হবে।

    জানালে খুশি হই।

    • গুরুজি

      বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় ইসলাম মোট কতো পর্ব হবে তা এখনো আমার জানা নাই। তবে ৩০ পারা কোরআনের সকল আয়াত সমূহ উপস্থাপিত হলে বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় ইসলাম সম্পূর্ণ ভাবে উপস্থাপিত হবে। আর তা এখনো সম্ভব হয় নি। ব্লগে চোখ রাখুন, ধীরে ধীরে সকল বিষয়ই উপস্থাপন করা হবে।

  • শুক্রধর

    অনেক দিন পরে ব্লগে ঢুকলাম এবং পড়লাম এই ধারাবাহিকের  পরের পর্বের অপেক্ষায় আছি ꫰

    • গুরুজি

      ব্যস্ততার কারণে ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে না পারার জন্য আমি আন্তরিক ভাবে দুঃখিত। তবে আশা করছি খুব শীঘ্রই লেখা পোষ্ট করতে পারবো।

Leave a Reply